তরুণীদের রক্তে স্নান করা পিশাচী রানী


এলিজাবেথ বাথোরি। জন্ম ১৫৬০ সালের ৭ আগষ্ট, হাঙ্গেরি। ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের রচয়িতা, এক নৃশংস সিরিয়াল কিলার। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৫৮৫ থেকে ১৬১০ সালের মধ্যে এলিজাবেথ প্রায় ৬৫০ জন তরুণীকে হত্যা করেছেন। গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ডে এলিজাবেথ বাথোরিকে সবচেয়ে বেশি ধূর্ত ও বর্বর খুনি নারী বলা হয়েছে। সময়টা ১৬০৯ সাল। হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় ম্যাথিয়াস তার নিজ প্রাসাদ থেকে দূরবর্তী সেজথে রাজপ্রাসাদে কিছু সৈনিক পাঠালেন। কারণ তিনি জানতে পেরেছিলেন কিছু নারীকে তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে সেখানে আটকে রাখা হয়েছে। আর সেই নারীদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাধর পরিবারগুলোর অনেকেই। নারীদের নিয়ে ঠিক কী ঘটছিল সেখানে তা জানার জন্যেই মূলত রাজা ম্যাথিয়াস তার সৈন্যবাহিনী পাঠিয়েছিলেন। সেখানে সৈনিকেরা পৌঁছার পর অনেক অজানা খবর জানতে পারেন রাজা ম্যাথিয়ান। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওই রাজপ্রাসাদটিতে থাকতেন ম্যাথিয়াসেরই প্রিয় কাউন্ট বা জমিদার ন্যাডাডির স্ত্রী কাউন্টেস এলিজাবেথ বাথোরি। এলিজাবেথ ছিলেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো বোন এবং পোল্যান্ডের রাজার বোন। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাউন্টেস পদবি ও তার রাজকীয় বংশ পরিচয়ের মাধ্যমে এলিজাবেথ হাঙ্গেরির উঁচু মহলে প্রবেশ করলেও তিনি ছিলেন হিংস্র। তার সৌন্দর্যের পেছনে লুকানো ছিল পশুত্ব, পাষণ্ডতা ও বর্বরতা। তৎকালীন হাঙ্গেরির সাধারণ মানুষের কাছে এলিজাবেথ ছিলেন একজন রহস্যময়ী নারী। তার হিংস্রতার জন্যে সে সময় তাকে ‘দ্য ব্লাডি কাউন্টেস’ নামে ডাকা হতো। অনেকে তাকে রক্তচোষা ড্রাকুলা বলত। অবশ্য নারী চরিত্রে এমন হিংস্রতার জন্য এলিজাবেথ একা দায়ী ছিলেন না। এর সঙ্গে ভাগ্য ব্যাপারটাও যুক্ত। তার শৈশবের নার্স লুনা জো-এর ভাষ্যে জানা যায়, এলিজাবেথ শৈশবে এক ভয়ানক মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন।


১৫ বছর বয়সে বিয়ে হবার পরপর এলিজাবেথের কাউন্ট স্বামী যুদ্ধে চলে যান। স্বামী যুদ্ধে চলে যাওয়ার পর নিঃসঙ্গ এলিজাবেথের সঙ্গে তার চাচার সখ্য বাড়ে। যিনি ছিলেন একজন শয়তানের উপাসক। সে সময় থেকেই তার ভেতরের বিকার প্রকাশ হতে শুরু করে। কালোজাদুর কারণে একের পর এক মানুষ খুন করতে থাকেন এলিজাবেথ। প্রায় ৬৫০ জন তরুণীকে হত্যার করা হলেও মাত্র ৮০ জনকে হত্যার দায়ে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। স্থানীয় কৃষক ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের তরুণীরাই ছিল এই হিংস্র কাউন্টেসের প্রধান শিকার। রাজার স্ত্রী হওয়া স্বত্ত্বেও অনেক পুরুষের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। তবে সেখানেও ছিল তার কপটতা আর হিংস্রতার ছাপ। এ ক্ষেত্রে তিনি সবসময় নারীদের ব্যবহার করতেন। নিজের কালোজাদু এবং যৌবন ধরে রাখার জন্যে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণীদের ধরে নিয়ে আসতেন। এরপর তাদের রক্তে স্নান করে শয়তানের উপাসনা করতেন। তার ঘরে সাধারণ কারও প্রবেশাধিকার না থাকলেও বিশেষ কয়েকজন মানুষ প্রবেশ করতে পারতেন। ধারণা করা হয়, এ মানুষগুলোই মূলত তার সব অপকর্মের সহযোগী ছিল। যাদের পরবর্তী সময়ে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।সে সময় কাউন্টেসের ঘর থেকে অনেক মৃত মানুষের হাড় এবং অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এলিজাবেথের এ নৃশংসতার কথা তৎকালীন রাজপরিবারের অনেকে জানলেও তার ক্ষমতাধর স্বামীর কারণে বলতে পারতেন না। যদিও শেষরক্ষা হয়নি এ কাউন্টেসের। যুদ্ধ থেকে ফিরে এলে কাউন্ট নিজেই স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এলিজাবেথের বিরুদ্ধে অনেক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থাকলেও তা প্রমাণে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল তৎকালীন বিচারিক আদালতকে। বিচার চলাকালীন তার দুই সহযোগী স্বীকার করে, প্রায় ৩৭টি হত্যার সাক্ষী তারা নিজেরাই। অবশ্য অন্য এক সহযোগীর মতে এ হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৫০। তবে মহলের নিরাপত্তারক্ষীদের মতে, কাউন্টেসের নির্দেশে তারা প্রায় দুইশত লাশ সরিয়েছেন। কিন্তু বিচারের এক পর্যায়ে একজন সাক্ষী আদালতে এলিজাবেথের লিখিত একটি খাতা হাজির করেন, যেখানে ৬৫০ জনের একটি তালিকা ছিল- যার সবাই কাউন্টেসের রক্তস্নানের উপকরণ হয়েছিলেন। অভিযোগে কাউন্টেসের তিন সহযোগীর মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং কাউন্টেসকে নিজ মহলের উপরের ঘরে নির্বাসন দেয়া হয়। সে ঘরে নির্বাসনে থাকাকালীন ১৬১৪ সালের ২১ আগস্ট ৫৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তরুণীদের রক্তেস্নান আর পাপাত্মার উপাসনা করেও দীর্ঘায়ু হতে পারেননি এ ঘৃণ্য পিশাচী।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আগের ব্লগ পড়ুন পরের ব্লগ পড়ুন
HTML tutorial