বাংলাদেশের এফ আর খান, বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি ও পুরকৌশলী


একসময়ের পৃথিবীর অন্যতম উচ্চ ভবন শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার। ১০৮ তলা ভবনটির কথা উঠলেই মনে পড়ে এর স্থপতি ফজলুর রহমান খানের কথা। তিনি এই পৃথিবীর অন্যতম উচ্চ ভবন এর নকশা প্রণয়ন করেন। তাঁকে বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ পুরকৌশলী ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন বলা হয়।

জন্ম এবং বেড়ে ওঠা

এফ আর খানের জন্ম ঢাকায় বংশালের আগামাসি লেনে এফ আর খানের ১৯২৯ সালের ৩ এপ্রিল। ১৯৪৪ সালে আরমানিটোলা স্কুল থেকে থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তাঁর বাবার নাম খান বাহাদুর আবদুর রহমান খান এবং মা খাদিজা খাতুন। তিনি ছিলেন দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা বিভাগের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা। যিনি এক সময় জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষও ছিলেন।

শিক্ষাজীবন

তিনি ১৯৪৪ সালে আরমানিটোলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতার শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, শিবপুর) ভর্তি হন। ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে পঞ্চাশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তিনি ঢাকায় ফিরে এলে তৎকালীন আহসানউলাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বাকি পরীক্ষা সমাপ্ত করেন ৷ কলকাতার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার এবং আহসানউলাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পরীক্ষার উভয় ফলের ভিত্তিতে তাঁকে বিশেষ বিবেচনায় ব্যাচেলর অফ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি প্রদান করা হয় ৷ এ মূল্যায়নে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন জনাব এফ আর খান ১৯৫২ তে যুগপৎ সরকারী বৃত্তি ও ফুল ব্রাইট বৃত্তি নিয়ে পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন ৷ সেখানে ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয় অ্যাট আরবানা শ্যাম্পেইন থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তত্ত্বীয় ও ফলিত মেকানিক্স-এ যুগ্ম এম এস করার পর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ৷
 

কর্মজীবন

ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনের পরপরই তিনি আহসানউলাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপকের পদে নিযুক্তি লাভ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি শিকাগো শহরের স্কিডমোর, ওউইং ও মেরিল নামের প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৫৬ সালে দেশে ফিরে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পূর্ব পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে আমেরিকার স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিড মোর এর আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে এ কোম্পানীর শিকাগো অফিসের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন ৷ পাশাপাশি তিনি আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি এর স্থাপত্য বিভাগে অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত হন । সেখানে পরে তিনি প্রফেসর এমিরিটাস হয়েছিলেন ।

ফজলুর রহমান খানের উদ্ভাবনের মূল দিকটিই ছিল আকাশচুম্বী ভন নির্মাণে টিউব পদ্ধতির ব্যবহার। আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির জয়জয়কার শুরু হয় ষাটের দশক থেকে। অনেকে বলেন এফ আর খান তার অন্যান্য উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষকে আকাশের অসীমতায় থাকার সুযোগ দিয়েছেন।
টিউব স্ট্রাকচারের প্রথম ভবন ডিউ-ইট চেস্টনাট এপার্টমেন্ট নির্মিত হয় শিকাগোয়, ১৯৬৩ সালে। দুই দশক ধরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবনের খেতাবটি ধরে রেখেছিল এফ আর খানের সিয়ার্স টাওয়ার (মালিকানা বদলের পর বর্তমান নাম উইলিস টাওয়ার)। এখনো এটি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভবন এবং পৃথিবীর অষ্টম উচ্চতম ভবন। ৪৪২ মিটার উঁচু ১১০ তলা এই ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৭৩ সালে।

গনচুম্বী ইমারত ছাড়াও বেশকিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপনার নকশা করেছিলেন এফ আর খান। এর মধ্যে জন হ্যানকক সেন্টার এর নকশা (১০০ তলা), জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, হজ্ব টার্মিনালের ছাদ কাঠামো (৫০,০০০ বর্গফুট), মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য নকশা, কলোরাডো স্প্রিং-এ যুক্তরাষ্ট্র বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মিনিয়েপোলিসের হিউবার্ট এইচ হামফ্রে মেট্রোডোম অন্যতম।

সম্মাননা ও কৃতিত্ব

  • ডঃ এফ আর খান নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, লি হাই বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইস ফেডারেল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ৷
  • তিনি ১৯৭২ সনে 'ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ রেকর্ড'-এ ম্যান অব দি ইয়ার বিবেচিত হন।
  • পাঁচবার স্থাপত্য শিল্পে সবচেয়ে বেশী অবদানকারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিহিত হবার গৌরব লাভ করেন (৬৫,৬৮,৭০,৭১,৭৯ সালে)৷
  • ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এর সদস্য নির্বাচিত হন।
  • ১৯৭৪ সনে আমেরিকার 'নিউজ উইক' ম্যাগাজিন শিল্প ও স্থাপত্যের উপর প্রচ্ছদ কাহিনীতে তাঁকে মার্কিন স্থাপত্যের শীর্ষে অবস্থানকারী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে ৷
  • ১৯৯৯ সালে তাকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।
  • ১৯৯৯ সালে ফজলুর রহমান খানের স্মরণে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে । ৪ টাকা মূল্যমানের এই টিকিটটিতে রয়েছে ফজলুর রহমান খানের আবক্ষ চিত্র, আর পটভূমিতে রয়েছে সিয়ার্স টাওয়ারের ছবি ।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই প্রকৌশলীর ৮৮তম জন্মদিন ছিল গতকাল। এ উপলক্ষে বিশেষ ডুডল বানিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে গুগল। বহুতল ভবনের আদলে গড়া ডুডলটির ঠিক মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে তাঁর অমর কীর্তি সিয়ার্স টাওয়ার। আর ভবনটির সমান উচ্চতায় নিজের তৈরি ভবনটি সবার সামনে উপস্থাপন করছেন ফজলুর রহমান খান। 

স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ভূমিকা

তিনি ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রবাসে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন ৷ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে।

গবেষণা

এফ, আর, খান মুসলিম স্থাপত্য বিষয়ের উপর নানা ধরনের গবেষণা করেছেন ৷ ডঃ খান Tube in Tube নামে স্থাপত্য শিল্পের এক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যার মাধ্যমে অতি উচ্চ (কমপক্ষে একশত তলা) ভবন স্বল্প খরচে
নির্মাণ সম্ভব ৷ গগনচুম্বী ভবনের উপর সাত খন্ডে প্রকাশিত একটি পুস্তকের তিনি সম্পাদনা করেন ৷

মৃত্যু

১৯৮২ সনের ২৬শে মার্চ জেদ্দায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন ৷ মৃত্যুর পর তার দেহ আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং শিকাগোতে তাকে সমাহিত করা হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আগের ব্লগ পড়ুন পরের ব্লগ পড়ুন
HTML tutorial