আধুনিক টাঁকশাল

রকিবের নলেজ কলেজের গণ্ডি না পেরোলেও ছেলেটা মা-বাবার নাম উজ্জ্বল করেছে। ছাত্রজীবনে বেচারার লেখাপড়ার অবস্থার বুকভাঙা বিবরণ জানতে তার ফেসবুকের স্ট্যাটাসগুলো ধারাবাহিকভাবে পড়তে পারেন। স্বভাবতই প্লেনের পেছনের বগি লাফায় না; কিন্তু ক্লাসের পেছনের অংশে বসে এ ছেলে লাফালাফির তালেই থাকত। ট্রাকের ফুয়েল (ডিজেল) ট্যাংকের ওপর যেমন লেখা থাকে ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, তেমনি রকিবের মায়ের মুখভঙ্গি সব সময়ই যেন বলতে চাইত, ‘ছেলের জন্ম থেকে জ্বলছি’।
তার পরও ঘরের প্রতি ছেলের যে টান (হোমিওপ্যাথি!), কোনো যুগেই তেমনটি দেখা গেছে বলে মনে হয় না। ঘরপাগল এ ছেলে প্রায়ই স্কুল পালিয়ে ঘরে চলে আসত।
রকিবের জনক-জননী ছেলের আশঙ্কাজনক (আশঙ্কাজননীও বলতে পারেন) অবস্থা দেখে হালই ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বছর তিনেক আগে যখন প্রেয়সীর ছ্যাঁকা খেয়ে তার মন-পোড়ার গন্ধে চারদিক ম-ম করছিল, তখন হঠাৎ একদিন আমাদের রকিব যেন আড়মোড়া ভেঙে টানটান হয়ে উঠে দাঁড়াল। ছেলে বাস্তবতা বুঝতে শিখল। আসলে সব প্রাণীই পোষ মানে, শুধু মানুষই মানে না; এ জন্য ছ্যাঁকা বলতে গেলে দেশের জাতীয় ‘খাবারে’ পরিণত হয়েছে। রকিব নিজেকে সান্ত্বনা দিতে লাগল এই সংলাপ দিয়ে, ‘খাঁটি মধুতে যেমন পিঁপড়া ধরে না, তেমনি সাচ্চা হূদয়ের পুরুষের জীবনে কোনো প্রেমিকা থাকে না।’ বন্যেরা বনে সুন্দর, কপিলার মুখে কপিলার উক্তি সুন্দর আর রকিবের সংলাপ সুন্দর রকিবের মুখে!
ছাত্রজীবনে পড়াশোনার ‘শোনা’ শব্দের মধ্যেই তার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলেও বাস্তবতা-জ্ঞান হওয়ার পর তা সম্প্রসারিত হয়েছে পড়ানোতে। রকিব কিছুদিন আধপেটা কোচিং সেন্টার পরিচালনা করলেও এখন ফুল সুইংয়ে স্কুল চালাচ্ছে। এ বছর আবার শুরু করেছে উন্নয়নের নামে ডোনেশন (অনুদান) কার্যক্রম। ছাত্র তো ভর্তি হবেই, পাশাপাশি চলবে উপরির বিজনেস। স্কুল তো নয়, যেন আধুনিক টাঁকশাল! পানের বরজে যেমন অগণিত পানপাতা থরে থরে ধরে থাকে, তেমনি স্কুল যেন টাকার বরজ। তবে কিছু সেয়ানা মুরব্বি এর বিপক্ষে বেশি ভ্যাজর-ভ্যাজর করছেন; নাম কামানোর উপায় আরকি! সেসবে কান দিলে চলবে কেন? কবিরা ‘অণুকাব্য’ লিখতে পারবে; কিন্তু শিক্ষকেরা ‘অনুদান’ নিতে পারবে না, তা তো চলবে না।
দেশের অর্থনীতি যখন ঝিমানি রোগে আক্রান্ত, তখন রকিবের অর্থনৈতিক অবস্থা টগবগিয়ে এগিয়ে চলেছে। তবে এ জন্য তাকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয় না। মানুষের পকেট থেকে টাকা বের করা মহাবিশ্বের কঠিন কাজগুলোর একটি। তাই পরিস্থিতির ঠেলাতেই রকিব এখন চটপটে হয়ে উঠেছে। সব সময় মুখে জ্বালাময়ী বক্তব্য, যেন কেউ তাকে পেট্রল খাইয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া এখন তো এ দেশে কথা না বলতে পারলে চলবে না; নীরব থাকলেই গুপ্তহত্যার শিকার হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছদ্মবেশে কেউ ধরতে এলে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। এটা তো যেনতেন ব্যাপার না। মিউমিউ করলে তো মাস্ট ধরা!
এ বছরই বিয়ে করতে যাচ্ছে আমাদের রকিব। বিয়ের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রচুর টাকা প্রয়োজন। স্কুলটার ডোনেশনের অর্থ দিয়েও বিয়ের খরচ কুলানো যাবে না। দ্রব্যমূল্য-বাসভাড়া যে গতিতে বাড়ছে, তাকে যদি আমরা দ্রুতগতি বলি, তাহলে স্বর্ণের দাম বাড়ছে রকেটগতিতে! তা ছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠানে মানুষ খাওয়ানোর ঝক্কি তো আছেই। হঠাৎ রকিবের মাথায় একটা বুদ্ধি এল। মানুষ খাওয়ানোর টাকা মানুষের কাছ থেকেই নিতে হবে। তাই সে আরেকটা স্কুল দেবে। আর আরেকটা স্কুল মানেই তো আরও ডোনেশন, আরেকটা টাকার বরজ—আরেকটা টাঁকশাল!
মানুষ খাওয়ানোর টাকা মানুষের কাছ থেকেই নিতে হবে। তাই সে আরেকটা স্কুল দেবে। আর আরেকটা স্কুল মানেই তো আরও ডোনেশন, আরেকটা টাকার বরজ—আরেকটা টাঁকশাল!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আগের ব্লগ পড়ুন পরের ব্লগ পড়ুন
HTML tutorial